you're reading...
Sports

লিওনেল মেসিঃ এক অসমাপ্ত রূপকথার পরাজিত মহানায়ক!

lionelmessi.jpg.size.custom.crop.1086x690

এখনকার ফুটবল-প্রেমীদের মধ্যে ব্রাজিল সমর্থক যাদেরকে আমার কাছে বিজ্ঞ (আমি বিজ্ঞ কথাটা পজিটিভ অর্থে ব্যবহার করছি) মনে হয় তারা আসলে সবাই ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিল-এর খেলা দেখে ব্রাজিল সমর্থক । সেই বিশ্বকাপের খেলা সরাসরি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি, তবে এখন রেকর্ডেড খেলা দেখে অবাক লাগে যে এত নান্দনিক ফুটবল কিভাবে খেলে মানুষ । যাই হোক, আমি প্রথম বিশ্বকাপ খেলা দেখি ১৯৯৮ সালে । সেই সময়ে বড়দের মুখে ম্যরাডোনা নামের এক রূপকথার নায়ক এর গল্প শুনে আর্জেন্টিনার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি । পাশাপাশি স্কুলে যাওয়া এবং আসার পথে বিভিন্ন দোকানে হারকিউলিস লুকের বাতিস্তুতার দর্শনীয় পোষ্টার দেখে আর্জেন্টিনার প্রতি আগ্রহের মাত্রা বাড়তে থাকে সমানুপাতিক হারে। খেলা দেখতে শুরু হলে জানতে পারি নতুন ম্যরাডোনা ওর্তেগার কথা।

বিশ্বকাপের সময় গড়ায় আর আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল এর সমর্থকরা চায়ের কাপে ঝড় তুলে, আমি খেলা দেখি আর বাতিস্তুতা-ওর্তেগার খেলা নিয়ে ভাবতে থাকি । একসময় আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় আর আমি আমার মনের ভিতর এক হালকা ব্যথা অনুভব করি, বুঝতে পারি আমি আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসি । তারপর, ২০০২ এর বিশ্বকাপে দাপটের সাথে খেলতে এসে প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় …… কিচ্ছু বলার ছিলনা । তারপর ২০০৬ এবং জার্মানি-দূস্বপ্নের শুরু…. ট্রাইব্রেকারে  জার্মান পরাশক্তির কাছে নান্দনিক ফুটবলের বিদায়, কিন্তু এই বিশ্বকাপেই আর্জেন্টিনার আশার আলো হয়ে আসে আরো একটি নাম। বার্সেলোনাতে খেলা এক আর্জেন্টাইনের গল্প তখন ডালপালা মেলে ঘুরে বেড়ায় সবার মুখে মুখে । সার্বিয়ার সাথে শেষ মুহুর্তে নেমে গোল করে সেই নতুন ম্যরাডোনা (!) লিওনেল মেসি। শুধু মেসির কারনে নিয়মিত দর্শক হলাম স্প্যানিশ লা-লিগার, ফ্যান হলাম বার্সেলোনার এবং স্বপ্ন বোনা শুরু হলো আর্জেন্টিনার নতুন সময়ের।

maxresdefault

২০১০ এর বিশ্বকাপ শুরু হলো অনেক আশা-ভরশা নিয়ে, নিঃসন্দেহে তার পুরোতা মেসিকে ঘীরে। কারণ ততোদিনে বার্সেলোনায় যাদুকরী ফুটবল দিয়ে মেসি তারকাদের তারকা। বার্সেলোনার মেসির অন্য গ্রহের ফুটবলের মোহে প্রত্যাশার পারদ তখন আকাশচুম্বী! মেসি খেলল কিন্তু গোল পেলোনা, তারপরও মেসিকে আমার আক্ষরিক অর্থে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ই মনে হলো । কিন্তু ইতিহাস আরো একবার আর্জেন্টিনার গল্পের প্রতিফলন হয়ে আসলো, ১৯৯০ এবং ২০০৬ এর জার্মান দুঃস্বপ্ন আরো একবার আর্জেন্টিনার নিয়তি হয়ে আর্জেন্টিনার সামনে এসে দাড়াল। জার্মানদের গতির ফুটবলের সামনে ল্যাটিন আমেরিকার ছোট পাসের নান্দনিক ফুটবল তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়লো। অনেকেই বললো ২০১০ বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার নতুন পথচলার শুরু, সম্ভাবনা দেখতে লাগলেন ২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সফলতার। ২০১৪ বিশ্বকাপে মেসি তারকা না মহাতরকা, যার তুলনা হচ্ছে সাবেক অনেক কিংবদন্তীদের সাথে, যে আলোচনায় প্রতিনিয়ত শিরোনামে থাকেন সাবেক লিজেন্ডরা। কখনও তুলনার খাতিরে, কখনও নিজেরা বিবৃতি দিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই ২০১০ এর বিশ্বকাপের মেসির চেয়ে ২০১৪ এর মেসি ছিলেন অনেক পরিণত। ক্লাবের হয়ে সম্ভব সব কাপ জেতা মেসির জীবন্ত কিংবদন্তি হতে শুধু দরকার ছিলো জাতীয় দলের হয়ে বড়ো শিরোপা, এই বিশ্বকাপটাই হতে পারতো তার জন্য সবচেয়ে বড়ো মঞ্চ। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, দুর্দান্ত খেলে দলকে ফাইনাল পর্যন্ত নিলেন কিন্তু এই গ্রহের আধরা স্বপ্ন আরো একবার ফাঁকি দিলো অন্য গ্রহের এই ফুটবলারকে। ক্লাবের লিজেন্ড জাতীয় দলের হয়ে তার ব্যর্থতার গল্পটাকে আরো একটু প্রসারিত হতে দেখলেন। কাঁদলেন এবং কাঁদালেন…… আর্জেন্টিনার ফুটবল মঞ্চে বিজয়ীর উল্লাস দুঃস্বপ্নের ক্রোড় হাসি হয়ে আঁচড়ে পড়লো জার্মান সোনালী প্রজন্মের কাছে।

150610165210-lionel-messi-qatar-airways-super-169

কিন্তু ফুটবলার মেসির জয়যাত্রা অব্যাহত থাকলো। ক্লাবের হয়ে দানবীয় ফুটবল আর ক্লাব শিরোপাতে মেসির তৃপ্ত চুমুক, পুরনো বিতর্ককে নতুন করে চাঙ্গা করে। কিন্তু মেসি চালিয়ে গেলেন আকাশি-সাদা জার্সিতে তার প্রচেষ্টা। পরের বছরই ২০১৫ সালে ল্যাটিন ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিরোপা কোপা আমেরিকার লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মেসি। দলকে নিয়ে যান ফাইনাল পর্যন্ত, কিন্তু মেসির গল্পের চিত্র্যনাট্য থাকে অপরিবর্তিত। চিলির কাছে ট্রাইবেকারে হেরে ভেজা চোখে শূন্যে তাকিয়ে থাকা মেসি আরো একবার ভাগ্যদেবতার পরিহাসের শিকার। তারপরও থেমে থাকেননি তিনি, দৃঢ় কন্ঠে বলেছেন নিজের দেশের হয়ে লড়াই চালিয়ে যাবেন। সে লড়াইয়ে দুইটা কাপ তার জন্য শেষ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়, যার মধ্যে কোপা আমেরিকার শত বছর পূর্তি উপলক্ষে কোপা আমেরিকা ২০১৬ এবং ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ। কোপা আমেরিকা ২০১৬ তে জাতীয় দলের হয়ে নিজের গোলের অভ্যাসটা আরো নিয়মিত করার ইঙ্গীত দিনেল প্রথম কয়েকটা খেলায়। তারই সুবাদে, আর্জেন্টিনা দাপটের সাথে খেলেই পৌঁছে যায় ফাইনালে। বিধাতার সম্ভবত নতুন করে চিত্রনাট্য লিখতে ইচ্ছে হয়নি, তাই আগের বারের গল্পের শেষটা রেখে দিনেল ফাইনাল মঞ্চে, আগের বারের মতো এবারও ফাইনালে মুখোমুখি চিলি-আর্জেন্টিনা। অনেকেই ভাবলেন এবার হবে প্রতিশোধ …….. কিন্তু গল্পের শেষটা আসলেই অপরিবর্তিত! এবারও আর্জেন্টিনা হারলো চিলির কাছে, একই ভাবে ট্রাইবেকারে। কিন্তু মেসির জন্য গল্পের চিত্র্যনাট্যে কিছুটা পরিবর্তন, এবার সবাইকে অবাক করে দিয়ে দলের হয়ে প্রথম পেনাল্টি মিস করে মহানায়ক হয়ে খলনায়ক। খেলা শেষ হওয়ার পর আর্জেন্টিনার হারের মাতম শেষ হওয়ার আগেই আসে এই তারকার অবাক করা ঘোষণা, জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন না লিওনেল মেসি। “পৃথিবীতে পরাজিতদের কোন জায়গা নেই, পৃথিবীটা জয়ীদের জন্য তীর্থস্থান” – এই কঠিন বাস্তবকে মেনেই হয়তো সরে দাঁড়ালেন তিনি। শেষ পর্যন্ত যদি নিজের সিদ্ধান্তে অটুট থাকেন তিনি তাহলে শুধু মাত্র একজন “ক্লাব লিজেন্ড” হিসেবেই থেকে যেতে হবে এই তারকাকে।

14Lionel-Messi

ক্লাব বার্সেলোনার হয়ে তাঁর সাফল্য যেকোনো ফুটবলারের জন্যই ঈর্ষণীয়। ফিফার বর্ষসেরা খেতাব—ব্যালন ডি’অর জিতেছেন পাঁচবার। কিন্তু দেশের হয়ে ২০০৬ সাল থেকে তাঁর প্রাপ্তির ঘর শূন্যই। ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকের সোনার পদক ছাড়া আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল জার্সিতে কখনোই শেষ হাসিটা দিতে পারেননি। এটা আবধারিত যে, জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ না জিতলে, ক্লাবের অর্জন সর্বজন স্বীকৃত কিংবদন্তি হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। খোদ আর্জেন্টিনারই অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা তাদের সময়ে প্রথম সারির তারকা হিসেবে বিবেচিত হতেন যেমন ভেরন, রিকুয়েলমে, তেভেজ ইত্যাদি। এর বাইরে স্পেনের রাউল গঞ্জালয়েস, পর্তুগালের লুইস ফিগো, ইংল্যান্ডের রুনি, মাইকেল ওয়েন এর মতো তারকারা আজ কোন আলোচনায় নেই, নতুন প্রজন্মের ফুটবলের দর্শকরা এর সবেক খেলোয়াড়দের অনেক আগের প্রজন্মের খেলোয়াড়দের নাম জানে কিন্তু এই খেলোয়াড়দের চেনেইনা। সেই প্রাথমিক স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পড়া ফুটবলের কালো মানিক পেলে, ৮৬ বিশ্বকাপের অতিমানব ম্যরাডোনা, ২০০০ বিশ্বকাপের ফরাসি নান্দনিক পুরুষ জিদান, ব্রাজিলের সুযোগ সন্ধানী সবচেয়ে কার্যকর স্ট্রাইকার রোনালদো, ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের সর্বশেষ প্রজন্মের রোনাদিনহো, রিভালদো, কার্লোস এরা এখনও জীবন্ত, চায়ের কাপে ঝড় তোলা নাম একটা কারনে…… এরা সবাই জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ী তারকা। মেসির লিজেন্ডারি যেখানে তার সব জৌলুশ হারায়, সেখানে এরা সবাই মুগ্ধতার গল্পের নায়ক-পার্শ্ব নায়কের চরিত্রে আবির্ভূত হোন।

Jun 26, 2016; East Rutherford, NJ, USA; Argentina midfielder Lionel Messi (10) reacts after missing a shot during the shoot out round against Chile in the championship match of the 2016 Copa America Centenario soccer tournament at MetLife Stadium. Chile won. Mandatory Credit: Adam Hunger-USA TODAY Sports

Jun 26, 2016; East Rutherford, NJ, USA; Argentina midfielder Lionel Messi (10) reacts after missing a shot during the shoot out round against Chile in the championship match of the 2016 Copa America Centenario soccer tournament at MetLife Stadium. Chile won. Mandatory Credit: Adam Hunger-USA TODAY Sports

আর্জেন্টিনা আর মেসির এই অব্যাহত ব্যর্থতা যদি লক্ষ্য লক্ষ্য মাইল দূরে টিভিতে দেখা আমি, আপনি, আমাদের এতটা ব্যথিত করতে পারে তাহলে খোদ মেসিকে কতটা মর্মাহত করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা সে চিন্তার সুযোগটাকে অঙ্কুরেই গলা টিপে হত্যা করে। মানুষের উন্নয়ন আর পৃথিবী জয়ের এই দীর্ঘ যাত্রায় একটা জায়গায় মানুষ এখনও অসহায়। আবেগ আর বাস্তবতার এই দ্বন্দ্বে মানুষকে অসহায়ভাবে আত্নসমর্পণ করতে হয়েছে যুগে যুগে। মেসির এই আকষ্মিক সিদ্ধান্ত তারই প্রতিফলন। আজ থেকে কয়েক বছর পর যখন আবারও ফুটবলের লড়াই মাঠে গড়াবে, তখন হয়তো মেসির নাম এক দীর্ঘশ্বাস হয়েই থাকবে। দেশের হয়ে ব্যর্থতা তাকে শুধুই একজন “ক্লাব লিজেন্ড” করে রেখে দিবে ফুটবলের এই বর্নীল চিত্রনাট্যে! হারের বোঝা মাথায় নিয়ে জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানো, ইতিহাসের পাতায় তাকে চেনাবে এক অসমাপ্ত রূপকথার পরাজিত মহানায়ক হিসেবে!

Advertisements

About Md. Moulude Hossain

FinTech | AVP, Business Development KONA Software Lab Limited

Discussion

One thought on “লিওনেল মেসিঃ এক অসমাপ্ত রূপকথার পরাজিত মহানায়ক!

  1. A very magnificent,wonderful writing with lots of organized events. Specially I found a writer who is looking to represent the legendary activities of such a magical boy, Leo. I think he(writer) has done it perfectly. I’m going to love his writing. Take care.

    Posted by Ditee | June 29, 2016, 12:02 am

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: